Summary Of Ranger Rabindranath
কোনো এক আশ্চর্য বর্ণময় সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হয়ে ভাইঝি ইন্দিরাকে চিঠির মাধ্যমে তার সৌন্দর্য বোঝাতে গিয়ে শিলাইদহ থেকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘কত রকমেরই যে রঙ চতুর্দিকে ফুটে উঠেছিল সে আমার মতো সুবিখ্যাত রঙকানা লোকের পক্ষে বর্ণনা করতে বসা ধৃষ্টতা মাত্র।’ এ কি কেবলই পারিবারিক কৌতুক, না কি কৌতুকের আড়ালে এখানে বলা হয়েছিলো কিছু সত্য কথাও? প্রথম ইয়োরোপপ্রবাসে বাড়িতে লিখেছিলেন, ‘বর্ণিমা নিয়ে আর বেশী বকাবকি কোরব না’, যেটি পড়লে মনে হয়, বর্ণবিষয়ক আলোচনায় বাড়ির লোকেদের সঙ্গে কিশোর রবীন্দ্রনাথের বেশ তর্কাতর্কি হতো। রবীন্দ্ৰজিজ্ঞাসুদের কাছে সুপরিচিত তাঁর ১৮৯০ সালের বিদেশযাত্রায় লোহিত সাগরে ভাসমান অবস্থায় জাহাজ থেকে দেখা একটি সূর্যাস্ত, যেটির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি এক অদ্ভুত চঞ্চলতা বোধ করেছিলেন : ‘সমুদ্র এবং আকাশের অসীম স্তব্ধতার মধ্যে এই আশ্চর্য্য বর্ণের উদ্ভাস দেখে’ আমার কেবলি মনে হচ্চে এইটেকে ঠিক ব্যক্ত কর্তে পারি এমন ভাষা আমার কোথায়! কিন্তু আবার ভাবি, আবশ্যক কি? এ চঞ্চলতা কেন? এ কি কেবলই প্রকৃতির সৌন্দর্যের মুখোমুখি রোম্যান্টিক কবির ভাববিহ্বলতা, অথবা কি এখানে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অসহায়তাবোধও? রঙ-তুলি দিয়ে ছবি এঁকে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে আটক করতে না পারার জন্য কোনো সূক্ষ্ম অতৃপ্তি? সূর্যাস্তকালে যে-রঙ বিশেষভাবে রাজকীয় সেই রঙের স্বরূপ দেখতে না পারার জন্য, ফলে তার যথাযথ বর্ণনা দিতে না পারার জন্য কোনো অপূর্ণতাবোধ? রবীন্দ্রনাথের বর্ণদৃষ্টিতে যে কিছু বিশেষত্ব ছিলো, সে-কথা বলেছেন এমন কিছু নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চিনতেন, কিন্তু তাঁর লেখায়, তাঁর আঁকা ছবিতে সেই বিশেষিত দৃষ্টির যে একটা সুদূরপ্রসারী পরিণাম থাকবে সে-বিষয়ে আমাদের চেতনা ব্যাপক নয়। এর আগে কয়েকটি প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, কিন্তু এই বিষয়ে একটা পুরো বই লেখা হলো এই প্রথম। চারজন গবেষকের সম্মিলিত চেষ্টায় গ’ড়ে উঠেছে এই বৃহৎ আন্তর্বিদ্য গ্রন্থ। তাঁদের মধ্যে একজন সাহিত্যিক, একজন চিত্রশিল্পী, দুজন বিজ্ঞানী। সাহিত্য, চিত্র, বিজ্ঞান—তিন মাত্রার মিলনে এই অনুসন্ধান প্রখরতর হয়েছে। এঁরা বোঝার চেষ্টা করেছেন, ঠিক কী ছিলো রবীন্দ্রনাথের বর্ণদৃষ্টির বিশেষত্ব, এবং তাঁর লিখনের এবং অঙ্কনের ভাষায় তা কী স্বাক্ষর রেখে গেছে। তাঁর বর্ণদৃষ্টিতে যদি কোনো ঘাটতি থেকে থাকে, তা হলে তা সত্ত্বেও ভাষায় তথ্য চিত্রে তিনি কিভাবে হয়ে উঠলেন একজন মহৎ শিল্পী? প্রতিবন্ধের সঙ্গে সংগ্রাম কি উস্কে দেয় প্রতিভাকে, শাণিততর ক’রে তোলে তার ধারকে? কিভাবে রবীন্দ্রনাথ বর্ণনা দিতেন, গঠন করতেন বর্ণভাষা, নির্মাণ করতেন বর্ণপ্রতিমা, বৰ্ণরূপক? তাঁর রচনায় শ্রুতি বা ঘ্রাণ কি দৃষ্টির অপূর্ণতা দূর করতে সদাব্যস্ত? ছবির প্রতি আকর্ষণ সত্ত্বেও পুরোদস্তুর আঁকিয়ে হয়ে উঠতে তিনি যে এতটা দেরি করলেন, তার মূল কারণ কি ঐ বর্ণদৃষ্টির অপূর্ণতা? ঠিক কোন্ পথে তিনি হয়ে উঠলেন চিত্রশিল্পী? কী সেই আত্মনির্মাণের ইতিহাস? সেখানে কি কোনো বিদেশী প্রভাব কাজ করেছে, তাঁকে পথের সংকেত দিয়েছে? চিত্রকলায় তাঁর বর্ণব্যবহারের প্যাটার্ন কি বৈজ্ঞানিক প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে? এই বইয়ে পাঠকরা পাবেন রবীন্দ্ররচনাবলীর বর্ণভাষার পুঙ্খানুপুঙ্খ সমীক্ষণ, সাহিত্যিকের চিত্রী হয়ে ওঠার ইতিহাস, তাঁর ছবিতে বিদেশী প্রভাব এবং রেখারঙের ব্যবহার সম্পর্কে সচিত্র বিদগ্ধ আলোচনা, বর্ণদৃষ্টি বিষয়টির উপরে প্রাসঙ্গিক বৈজ্ঞানিক আলোকপাত, রবীন্দ্রচিত্রকলায় বর্ণব্যবহারের বৈজ্ঞানিক পরিমাপ, তা থেকে লব্ধ উপাত্তসমূহের বিশ্লেষণ। কোনো সন্দেহ নেই, রবীন্দ্রগবেষণায় এই বই এক অভাবিতপূর্ব সংযোজন, পাঠকের দৃষ্টির সামনে খুলে দেয় এক নূতন দিগন্তকে। এ বই পড়ার পর পাঠকরা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির দিকে পুরাতন দৃষ্টিতে আর তাকাতে পারবেন না। এই জাতের এবং মাপের আন্তর্বিদ্য গবেষণাগ্রন্থ সারা পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে বিরল।
Browse and Read other popular books at Spectrashop
To know more updates on books around the world click www.spectralhues.com



Reviews
There are no reviews yet.